তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
PM Tarique Rahmans family ai video

প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের এআই ভিডিও দিয়ে ঈদ উপহারের ভুয়া দাবি

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানের আদলে তৈরি একাধিক ভিডিও ছড়াচ্ছে অন্তত এক ডজন ফেসবুক পেজ থেকে। ভিডিওগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, ঈদ উপলক্ষ্যে উপহার বা বোনাস দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যরা। কখনো মন্তব্যে মোবাইল ব্যাংকিং নাম্বার দিতে বলা হচ্ছে, কখনো আবার বলা হচ্ছে মন্তব্যে দেওয়া লিংকে ক্লিক করতে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, সবকয়টি ভিডিও এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি এবং টাকা প্রদানের এসব দাবি ভুয়া। 

ডা. জুবাইদা রহমানের নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ফেসবুক পেজ থেকে ছয় সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একপাশে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অপর পাশে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এতে দাবি করা হয়, “ঈদ উপহার কর্মসূচী ২০২৬”-এর আওতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার হিসেবে সবার জন্য ২৫০০ টাকা ঈদ উপহার দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওতে লেখা হয়েছে, “সবাইকে ২৫০০/- ঈদ উপহার দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী। আবেদন করলেই টাকা পাবেন মোবাইলে। আবেদন লিংক কমেন্টে।”

“প্রধানমন্ত্রী ঈদ উপহার দিচ্ছেন” দাবি করা ভিডিও (বামে) এবং মন্তব্যের ঘরে দেওয়া লিংক (ডানে)।

মন্তব্যে দেওয়া লিংকে ক্লিক করলে নিয়ে যায় একটি ওয়েবসাইটে। এতে বাংলাদশের বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো দেখা যায়। সরাসরি যে ওয়েবসাইটে নিয়ে যায় তাতে লেখা, “📢 বিশেষ ঘোষণা: পবিত্র ঈদুল ফিতর ২০২৬ উপলক্ষ্যে নিবন্ধিত প্রতিটি পরিবারকে ২৫০০ টাকা করে ঈদ উপহার প্রদান করা হচ্ছে। এখনই নিচের বাটনে ক্লিক করে আবেদন নিশ্চিত করুন।” জানানো হয়, ঈদ উপহার ও ভাতা পোর্টাল ২০২৬” এর অনলাইন আবেদন ফরম এটি। এতে লেখা, “২০২৬ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সাধারণ নাগরিকদের জন্য এই বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনি যদি এখনো ফরমটি পূরণ না করে থাকেন, তবে দ্রুত “এখানে আবেদন করুন” বাটনে ক্লিক করে আপনার তথ্য জমা দিন।” 

ক্লিক করার পর সরাসরি আবেদন ফরমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিন সেকেন্ড অপেক্ষা করতে বলা হয়। তবে পরক্ষণেই সেটি একটি বেটিং সাইটে নিয়ে যায়। ওয়েবসাইটে আবেদনকারীর নাম এবং সঠিক মোবাইল অ্যাকাউন্ট নম্বর প্রদান করলে ভাতার টাকা সরাসরি মোবাইলে পৌঁছে যাবে জানানো হলেও এক্ষেত্রে কোন নাম্বার দিয়ে ফরম পূরণ করার প্রয়োজন হয় না।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের এআই ভিডিও দিয়ে ঈদ উপহারের ভুয়া দাবি
প্রতারণামূলক ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশট।

এই পেজ থেকে একই দাবিতে একাধিক ছবি (, ) ও ভিডিও (, ) ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। দেখা যায়, টাকা পাওয়ার প্রমাণ হিসেবে একটি মেসেজের স্ক্রিনশট যুক্ত করা হয়েছে। যাতে লেখা, “আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ ভাতার ২৫০০ টাকা আপনার একাউন্টে জমা হয়েছে। ধন্যবাদ”। 

এছাড়াও আরো অন্তত ১১টি পেজ থেকে ঈদ উপলক্ষ্যে টাকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে তারেক রহমান (, ), জুবাইদা রহমান  (, ) ও জাইমা রহমানের  (, , , , ) নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি পেজ ছাড়াও রয়েছে ধানের শীষ জিন্দাবাদ, ধানের শীষ অনুদান ফান্ড, প্রথম প্রহর ফাউন্ডেশন নামের পেজ।

এক ভিডিওতে ডা. জুবাইদা রহমানের আদলে একজনকে বলতে শোনা যায়, “বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন অথচ এখনও ঈদের কেনাকাটা করতে পারছেন না, তারা ভিডিওটি শেয়ার করে কমেন্টে যোগাযোগ করুন।” তেমনি আরেক ভিডিওতে দেখা যায় জাইমা রহমান বলছেন, “ঈদের কেনাকাটা করার জন্য বিএনপি দিচ্ছে এক লক্ষ টাকা। এই ভিডিওটা শেয়ার করলেই আপনার সাথে যোগাযোগ করা হবে।” সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের এক ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “এবার ঈদে সবাইকে দেওয়া হবে ২৫০০ টাকা করে বোনাস, এখনও যারা পেজটি ফলো করেননি ফলো করে কমেন্টে নাম ঠিকানা এবং বিকাশ নাম্বার দিন”। ভিডিওগুলো দেখছেন হাজার থেকে লাখ খানেক ফেসবুক ব্যবহারকারী, মন্তব্যও করছেন হাজার খানেক। মন্তব্যে দেখা যায়, ব্যাক্তিগত নানা প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে নিজেদের মোবাইল ব্যাংকিং নাম্বার দিচ্ছেন অনেকে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের এআই ভিডিও দিয়ে ঈদ উপহারের ভুয়া দাবি
কিছু ফেসবুক পেজের স্ক্রিনশট যেগুলো থেকে বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করে ঈদ উপলক্ষ্যে টাকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

অধিকাংশ ভিডিওর কি-ফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তারেক রহমান (, ), জুবাইদা রহমানজাইমা রহমানের পুরোনো ছবি সামনে আসে। পুরোনো ছবির এসব ভিডিও এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশন দিয়ে যাচাই করা হয়। হাইভ মডারেশন এসব ভিডিও-এর কথা বা বক্তব্য ৯৯.৯৯% এআই বলে শনাক্ত করে। 

এর আগেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জিয়া পরিবারের সদস্যদের আদলে তৈরি এআই ভিডিওর মাধ্যমে টাকা দেওয়ার দাবি প্রচার করা হয়েছিল। এরকম অন্তত ১৩টি পেজ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ডিসমিসল্যাব। এর মধ্যে বর্তমানে চারটি পেজ বন্ধ হয়ে গেছে এবং তিনটি পেজের নাম পালটে ফেলা হয়েছে। দুইটি পেজ পুরোপুরি বদলে নতুন নামে, ভিন্ন ধর্মী নতুন কন্টেন্ট তৈরি করছে। তবে তিনটি পেজ থেকে এখনো নতুন নতুন উপলক্ষ্য ঘিরে টাকা দেওয়ার ভুয়া দাবি প্রচার করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের এআই ভিডিও দিয়ে ঈদ উপহারের ভুয়া দাবি
এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশনের বিশ্লেষণ।

মেটা সেফটি সেন্টারে স্ক্যাম থেকে সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস এবং এসব প্রতারণা ও স্ক্যাম সাধারণত কীরকম হয়ে থাকে তা জানানো হয়েছে। প্রতারকরা প্রায়ই সেলিব্রিটি বা পরিচিত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণামূলক সাইটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলে জানায় মেটা। এ ছাড়াও সরকারি সংস্থা বা সেবার নাম ব্যবহার করেও ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চুরি করার চেষ্টা করা হয় এসব প্রতারণার মাধ্যমে। তারা আকর্ষণীয় অর্থের প্রলোভন দেখায়। যেমন দাবি করে যে আপনি লটারি জিতেছেন, বা সরকারি অনুদানের জন্য যোগ্য হয়েছেন। 

এখানে প্রতারকরা এই দুইটি কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করছে। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিওর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা মেটা যে “পাবলিক ফিগার সেজে প্রতারণা” সম্পর্কে সতর্ক করেছে তারই উদাহরণ। একই সঙ্গে ঈদ উপলক্ষে অর্থ বা বোনাস দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, যা “সরকারি সুবিধার ভুয়া দাবি”-এর কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর ব্যবহারকারীদের মন্তব্যে মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর দিতে বলা বা লিংকে ক্লিক করানো হচ্ছে—যা শেষ পর্যন্ত জুয়া বা প্রতারণামূলক সাইটে নিয়ে যাচ্ছে। মেটা-এর পরামর্শ অনুযায়ী, এ ধরনের অপ্রত্যাশিত অফার, অচেনা লিংক ও বেশি লোভনীয় শোনায় এমন প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ এগুলো প্রায়সময়ই প্রতারণার ফাঁদ হয়।  

আরো কিছু লেখা