তৌহিদুল ইসলাম রাসো

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
সাভারে আগুনে মৃত ইকবাল কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখা সেই ইকবাল নন
This article is more than 2 months old

সাভারে আগুনে মৃত ইকবাল কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রাখা সেই ইকবাল নন

তৌহিদুল ইসলাম রাসো

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হতে দেখা গেছে। বিভিন্ন পেজ (, , ), গ্রুপ (, , ) ও আইডিতে (, , ) শেয়ার করে বলা হচ্ছে পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিটি ২০২১ সালে কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে কোরআন রাখা আলোচিত মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, আগুনে মারা গেছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার বর্ণি গ্রামের ইকবাল হোসেন। দুইজন দুই ব্যক্তি।

একাধিক ফেসবুক গ্রুপে (, , , ) সময় টেলিভিশনের একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে সাভারে আগুনে মারা যাওয়া এই ইকবাল হোসেনই পূজা মণ্ডপে কোরআন রেখেছিলেন।  এক গ্রুপে শেয়ার করা পোস্টের ক্যাপশনে লেখা- “অগ্নি দগ্ধ অবস্থায় গদা ইকবালের মৃত্যু। এই সেই ইকবাল, যে কিনা বাংলাদেশে ২০২১ সালে দুর্গা পুজোর সময় হনুমানের পায়ের কাছে কুরআন রেখে ষড়যন্ত্র করে সারা বাংলাদেশের সকল সনাতনী উপর অজস্র নির্যাতন, লুঠপাট, প্রতিমা ভাঙচুর সহ কয়েকশো হিন্দু হত্যা করিয়েছিলো।” প্রায় একই ক্যাপশনে বাকি গ্রুপগুলোতে পোস্ট শেয়ার করতে দেখা গেছে।

বিভিন্ন ফেসবুক পেজেও (, , , ) একই দাবিতে পোস্ট শেয়ার করতে দেখেছে ডিসমিসল্যাব। এছাড়া ব্যক্তিগত প্রোফাইলেও (, , , , ) অনেকে সেটি কুমিল্লার ইকবাল বলে প্রচার করেন। এসব পোস্টের ক্যাপশনগুলো প্রায় একই রকমের এবং শেয়ার করা ফটোকার্ডও একই।

শেয়ার করা গ্রাফিক কার্ডের সূত্র খুঁজতে ফেসবুকে কিওয়ার্ড সার্চে শেয়ারকৃত গ্রাফিক কার্ডটি পাওয়া যায় ‘বাংলার সময়’ নামক পেজে। পেজটি বিশ্লেষণে দেখা যায় সেখানকার প্রায় প্রতিটি পোস্টেই সময় টিভির লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। সময় টিভির বিভিন্ন সংবাদের লিঙ্কও শেয়ার করতে দেখা গেছে পেজ থেকে।

গত ৩ এপ্রিল এই পেজেই ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। যেখানে ক্যাপশনে বলা হয়- “কথা ছিল ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসবেন ইকবাল হোসেন। কিন্তু সেই আসা আসবেন, তবে জীবিত নয় লা’শ হয়ে”। বিস্তারিত জানার জন্য সময় সংবাদের একটি লিঙ্কও শেয়ার করা হয় সেখানে। লিঙ্কে প্রবেশ করলে সেটি সময় টিভির ওয়েবপোর্টালের একটি সংবাদে নিয়ে যায়। ফটোকার্ডের শিরোনামের সঙ্গে হুবহু মিল থাকা শিরোনামের সেই সংবাদে বলা হয় গত ২ এপ্রিল সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে তেলবাহী লরি উল্টে ৫ গাড়িতে আগুন লাগার ঘটনায় ঘটনাস্থলেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান সিমেন্ট বোঝাই ট্রাকের শ্রমিক ইকবাল হোসেনসহ দুইজন। পরিচয়ে বলা হয় মৃত ইকবাল হোসেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের বর্ণি গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে। 

যাচাইয়ে আরো দেখা যায়, কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে কোরআন রাখা বহুল আলোচিত সেই ইকবালকে নিয়ে তার ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে মূলধারার গণমাধ্যম (, , , )।

২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর দূর্গা পূজা মণ্ডপে ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন রাখেন ইকবাল। ওই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে ইকবালকে পূজামণ্ডপে কোরআন রেখে গদা কাঁধে নিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। ২১ অক্টোবর কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে গ্রেপ্তার হলে কোরআন শরিফ রাখা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি। ২০২৩ সালে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল ইকবাল হোসেনকে ১৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন কুমিল্লা শহরের মুরাদপুর-লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে। 

যাচাইয়ে দেখা যায়, দুই ইকবালের চেহারায়ও কোনো মিল নেই। 

অর্থাৎ আগুনে মারা যাওয়া ইকবাল এবং পূজা মণ্ডপে কোরআন রাখা ইকবাল দুজন আলাদা ব্যক্তি। ছবি ছাড়াও দুজনের ঠিকানা এবং পিতার নাম ভিন্ন। তাই পূজা মণ্ডপে কোরআন রাখা ইকবালের সঙ্গে মারা যাওয়া ইকবালের কোনো সম্পর্ক নেই।

আরো কিছু লেখা