
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে চলছে যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিজ্ঞাপন। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া রেজাউল করিমের পুরোনো বক্তব্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করে এই ভিডিও বানানো হয়েছে। ভিডিওর স্ক্রিনে আসা লিংকে ক্লিক করে পণ্যের বিস্তারিত উল্লেখ থাকা একটি ভুয়া ওয়েবসাইটও পাওয়া যায়, যা সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টারের আদলে বানানো।
সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি প্রচারণামূলক ভিডিওতে দেখা যায়, সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন। তার দুই পাশে বিভিন্ন ইসলামী দলের কয়েকজন নেতাও দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিওর নিচের দিকে ডান কোণে সময় টেলিভিশনের লোগো আংশিকভাবে দেখা যায়। ভিডিওতে চরমোনাই পীরকে একটি যৌন শক্তিবর্ধক পণ্যের বিষয়ে প্রচারণামূলক কথা বলতে শোনা যায়। পণ্যটি ব্যবহার করে নিজেও ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলে জানান তিনি। ভিডিওর দৈর্ঘ্য মোট ২২ মিনিট হলেও প্রথম দুই মিনিটে তার বক্তব্যের অংশটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০ মিনিট একটি মিউজিক যুক্ত করে স্ক্রিন কালো করে রাখা।

ভিডিওটির সঙ্গে বিজ্ঞাপনে একটি ওয়েবসাইটের লিংক দেখা যায়। লিংকে ক্লিক করলে ডেইলি স্টারের আদলে তৈরি একটি ওয়েবসাইট সামনে আসে, যেখানে পণ্যটির বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন আছে। শিরোনামে লেখা আছে, “বাংলাদেশে একটি ওষুধ এসেছে, যা ডাক্তাররা ‘নপুংসকতা ধ্বংসকারী’ নামে অভিহিত করেন। প্রমাণিত: এটি ১০০ বছরের পুরুষদের মধ্যেও যৌনক্ষমতা ফিরিয়ে আনে”!
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘আলট্রা হট’ নামের একটি ওষুধ ১০০ বছর বয়সী পুরুষেরও যৌনক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে রহমত আলী নামের এক বৃদ্ধের গল্প বলা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারিক চিকিৎসা বিভাগের প্রধান ইউরোলজিস্ট ডা. এন. আই. ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ জাতীয় ইউরোলজি গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দাবি করা হয়েছে, ওষুধটি টেস্টোস্টেরন বাড়ায় এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই যৌন সমস্যার সমাধান করে। ৩ হাজার ৯৯৮ টাকায় ছাড় দিয়ে ওষুধটির বর্তমান দাম ১ হাজার ৯৯৯ টাকা দেখানো হয়েছে।
তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, ডা. এন. আই. ভূঁইয়া বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও ইউরোলজি বিভাগের প্রধান, শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এ বিষয়ে অধিকতর নিশ্চিত হতে ডিসমিসল্যাব তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, “আমি এই নামের (আলট্রা হট) নামের কোনো পণ্যের সঙ্গে পরিচিত নই।” অন্যদিকে “বাংলাদেশ জাতীয় ইউরোলজি গবেষণা কেন্দ্র” নামে কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশের এ সম্পর্কিত চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাম “জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট।”
প্রতিবেদনের শেষে বেশ কয়েকজনের নাম ব্যবহার করে ইতিবাচক রিভিউ বা মন্তব্য যুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া ওষুধটি কিনতে আগ্রহী ক্রেতাদের নাম ও মোবাইল নম্বর দিতে বলা হয়েছে। নিচে লেখা রয়েছে, “যদি আপনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফর্ম পূরণ করতে না পারেন, আপনার সংরক্ষিত প্যাকেটটি অন্য কারও কাছে চলে যাবে। কারণ পণ্যটি সীমিত পরিমাণে রয়েছে।”
যাচাইয়ে দেখা যায়, পণ্যটির প্রচারণায় ব্যবহৃত ভিডিওটি সৈয়দ রেজাউল করিমের একটি পুরোনো বক্তব্যের সম্পাদিত সংস্করণ। আট মাস আগে সময় টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করে মূল বক্তব্য বদলে দেওয়া হয়েছে। সময় টেলিভিশনের ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, “বৈঠকে যেসব বিষয়ে একমত ৫ ইসলামি দল।”

৩ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে রেজাউল করিম আগামী সংসদীয় নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচটি ইসলামি দলের ঐকমত্যের বিষয়ে কথা বলছিলেন। প্রচারণামূলক ভিডিওতে চরমোনাই পীরের বাম পাশে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মূল ভিডিওতেও তিনি একই স্থানে ছিলেন। এছাড়া মূল ভিডিওতে থাকা অন্য নেতাদের অবস্থান এবং সংবাদমাধ্যমের লোগোও হুবহু মিলে যায়।
অর্থাৎ, পুরোনো ও ভিন্ন প্রসঙ্গের ভিডিও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করে ওষুধের প্রচারণায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়।
ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, ‘গশ ইনসাইড’ (Gosh Inside) নামের একটি পেজ থেকে প্রচারণাটি চালানো হচ্ছে। ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ জানুয়ারি থেকে বিজ্ঞাপনটি প্রচারিত হচ্ছে।

পেজটির ট্রান্সপারেন্সি সেকশনে দেখা যায়, এটি ইউক্রেন থেকে পরিচালিত। তবে পেজে যোগাযোগের যে নম্বর দেওয়া আছে, তার কোড নাইজেরিয়ার। পেজটির লোকেশনেও নাইজেরিয়ার একটি ঠিকানা দেওয়া। এছাড়া পেজটিতে ‘মোনোলিজা আবুজা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট যুক্ত করা আছে। এটি নাইজেরিয়ার আবুজা শহরে অবস্থিত একটি আধুনিক স্পোর্টস ও বিনোদন কেন্দ্র।

ডিসমিসল্যাব এর আগেও একই ধরনের স্বাস্থ্যপণ্যের ভুয়া প্রচারণা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল, ‘অপ্টিম্যাক্স’ নামের একটি চোখের ওষুধের প্রচারণায় প্রথম আলো, বিবিসি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট নকল করা হয়। সেখানেও বিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি সাহা, শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং খ্যাতনামা চিকিৎসকদের ভুয়া সাক্ষাৎকার ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি ছিল মূলত বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশে সক্রিয় একটি আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র।