ফাতেমা তাবাসুম

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
ঝলমলে মেট গালায় এআই ছবির কালো ছায়া

ঝলমলে মেট গালায় এআই ছবির কালো ছায়া

ফাতেমা তাবাসুম

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছিল কস্টিউম শিল্পে বিশ্বের অন্যতম ফ্যাশন প্রদর্শনী “মেট গালা ২০২৪।” কল্পবিজ্ঞান লেখক জে জি বেলার্ডের “দ্য গার্ডেন অব টাইম” গল্প অবলম্বনে এবারের পোশাকের কোড ও থিম নির্বাচন করা হয়েছিল “স্লিপিং বিউটিস: রিঅ্যাওয়েকেনিং ফ্যাশন।” ৬ মে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব আর্টস প্রাঙ্গণে জমেছিল চোখ ধাঁধানো এ আসর। লালের বদলে সবুজ গালিচায় হেঁটেছেন নামি দামি বহু স্বনামধন্য অভিনয় শিল্পী। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড়ের গতিতে চলছে সেসব ছবি শেয়ার করার প্রতিযোগিতা। তবে এই ছবির ভিড়ে এমন অনেকের ছবিও শেয়ার হচ্ছে যারা আসরে অংশই নেননি।

হার্পার বাজার তাদের ওয়েবসাইটে ২০২৪ মেট গালায় প্রতিটি সেলিব্রিটি রেড কার্পেট সাজপোশাক– এর ছবি প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় নেই কেটি পেরি, লেডি গাগা, বিয়োন্সের মত পপ তারকাদের কোনো ছবি। এরপরও তাদের মেট গালা ২০২৪ সাজপোশাকের বেশ কিছু ছবি ইতঃমধ্যে ভাইরাল হয়েছে নেট দুনিয়ায়। যারা শেয়ার দিচ্ছেন তারা বুঝতেও পারছেন না ছবিগুলোর একটিও আসল নয়, বরং এআই তথা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। এসব ছবির কাছে বোকা বনেছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, বাদ যাননি কেটি পেরির মা-ও। ছবিগুলো দেখতে এতোটাই নিখুঁত, যে আসলে ছবিগুলো যে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে তৈরি তা তারা ধরতে পারেনি।

ছবিগুলো মূলত ছড়াতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে। কেটি পেরির এআই এডিডেট ছবি তুলনামূলক বেশি ছড়িয়েছে।

ডিসমিসল্যাব কেটি পেরির নকল মেট গালা লুকের ছবিটির উৎস খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে পুরাতন যে পোস্টটি খুঁজে পায় তা এক্স-এ। তবে ৬ মে মেট গালার অফিশিয়াল ইভেন্টের পর যে ছবিটি কেটি পেরির মেট গালা লুকের ছবি দাবিতে প্রথম পোস্ট হয় ও প্রায় ৬৭ হাজার বার রিপোস্ট সেই এক্স পোস্টের ভিউ ১৬ মিলিয়নেরও বেশি। পোস্টটির কমেন্টস ঘাটলে বোঝা যায় ফেক ছবিটির উদ্দেশ্য অনেকটাই স্বার্থক। শুরুতে প্রায় সবাই এটিকে কেটি পেরির মেট গালা ২০২৪-এর লুক হিসেবে বিশ্বাস করেছিল। কেও প্রশ্ন তোলেনি। এমনকি কেটি পেরির মা ম্যারি পেরিও বিশ্বাস করে বসেন এটি তার মেয়ের ছবি। 

গালা ডামাডোলে কেটি পেরির আরও একটি এআই ছবি ভাইরাল হতে দেখা যায়। পরপর দুটি ফেক ছবি ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় এই পপ তারকা নিজে তার ইনস্টাগ্রাম থেকে ছবি দুটি শেয়ার করেন; সেই সঙ্গে ভক্তদের জানান যে ব্যস্ততা হেতু তিনি এবারের মেট গালায় যেতে পারেননি, যে দুটো ছবি অনেকেই শেয়ার করছেন এগুলো আসল নয়। একই সাথে তিনি একটি স্ক্রিনশটও জুড়ে দেন যেখানে দেখা যায় মা ম্যারি পেরি কেটিকে খুদে বার্তা পাঠাচ্ছেন: “তুমি মেটে গিয়েছিলে জানতাম না… কি গর্জিয়াস গাউন, তোমাকে রোজ প্যারেডের মতো লাগছে, তুমি তোমার মতো করে ভাল থাকো হাহা।” উত্তরে কেটি তার মাকে সতর্ক করে বলেন, “এআই তোমাকেও পেয়ে বসল মা।” 

কেটির ছবিটিকে খুব সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে কীভাবে যাচাই সম্ভব ছিল যে কেটি পেরির ছবিটি নকল; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। পলিটিফ্যাক্ট বলছে, ছবিটিতে কেটি যে গালিচা বিছানো সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন তা এ বছরের গালার নয়। এটি দেখতে অনেকটা ২০১৮ সালের মেট গালার গালিচা বিছানো সিঁড়ির পুরানো ছবিগুলোর সাথে মিলে। এ বছরে সিঁড়ি ও গালিচার রঙ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন– মাঝ বরাবর ক্রিম সাদা রঙ এর দুইপাশে শ্যাওলাটে সবুজাভ বর্ণ। এছাড়াও ছবিতে কেটির পিছে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পাপারাজ্জিদের অংশটুকুও কিছুটা বিকৃত, যা এআই তৈরি ছবিগুলোতে প্রায়শই হতে দেখা যায়

শুধু কেটি পেরি নয়, ভাইরাল হয়েছে লেডি গাগা, বিয়োন্সে, রিয়ানা– এর মত পপ তারকাদের এআই জেনারেটেড ছবিও, যাদের কেউই এবছর মেট গালার সবুজ গালিচায় হাঁটেননি। এর বাইরেও আরও বেশ কিছু তারকার এআই-তৈরি মেট গালার ছবি নেট দুনিয়ায় ছড়াতে দেখা যায়। যার মাঝে ছিলেন কিম কারদাশিয়ান ও তার প্রাক্তন পপ র‍্যাপার স্বামী কানইয়ে ওয়েস্ট, ডুয়া লিপা, বেলা হাদিদদের মত তারকাদের ফেক এআই ছবি। এদের মাঝে ডুয়া লিপা আর কিম কারদাশিয়ান মেট গালা-২০২৪ এ উপস্থিতও ছিলেন। এরপরও তারা এআই মেকি সম্পাদনার স্বীকার হন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘বার্তা ২৪’ ৭ মে, ২০২৪ “মেট গালায় অদ্ভূত পোশাকে হাজির হওয়া ১৬ তারকা” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যাচাইয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যমটি ধরতে পারেনি যে লেডি গাগা, বেলা হাদিদ, কিম কারদাশিয়ান ও কানইয়ে ওয়েস্টের যে ছবিগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে এগুলো আদতে এআই দিয়ে তৈরি।

সেলিব্রিটিদের নকল এআই ছবি নিরীহ সম্পাদন মনে হলেও বিখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিন ফোর্বস বলছে এমনটি চলমান থাকলে তা ধারণ করতে পারে ভয়াবহ রূপ। “মার্গারেট রবি ও সেলিনা গোমেজের মত সেলিব্রিটিদের এআই নগ্ন ছবি বিক্রি হচ্ছে ই-বে তে” শীর্ষক ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিভাবে এআই ব্যবহার করে ভুয়া পর্নোগ্রাফির মত অপরাধের শিকার হতে হয়েছে বিভিন্ন সেলিব্রিটিদের। ফোর্বস বলছে, এআই ভয়াবহ হয়ে উঠবার আগেই এর ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠছে অনেক সেলিব্রিটি।

আরো কিছু লেখা