ইশরাত জাহান তাঞ্জু

অতিথি লেখক
আইনস্টাইন কি আসলেই বলেছেন ৮০ বছর পর পৃথিবীর প্রজন্মগুলো হবে নির্বোধ?
This article is more than 1 year old

আইনস্টাইন কি আসলেই বলেছেন ৮০ বছর পর পৃথিবীর প্রজন্মগুলো হবে নির্বোধ?

ইশরাত জাহান তাঞ্জু
অতিথি লেখক

গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বরাতে একটি উক্তি প্রচারিত হচ্ছে। এতে বলা হয় ৮০ বছর আগে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, “একদিন হয়তো প্রযুক্তি মানুষের ভাব আদানপ্রদান নষ্ট করে দেবে, ফলে পৃথিবীতে একটি নির্বোধ প্রজন্ম জন্মাবে।” তবে ডিসমিসল্যাব কোনো বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে আইনস্টাইনের এমন কোনো উক্তি খুঁজে পায়নি। এর আগে ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা স্নোপস এবং পলিটিফ্যাক্ট-ও উদ্বৃতিটি আইনস্টাইনের নয় বলে জানিয়েছে। 

বাংলাদেশে ২০১৫ সাল থেকে আইনস্টাইনের নামে উক্তিটি বারবার ফেসবুকে ঘুরেফিরে আসছে। সবচেয়ে পুরনো পোষ্টটি পাওয়া যায় ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবরের, যেখানে একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি ছবি শেয়ার করা হয় যাতে দেখা যায় ছবিসহ আইনস্টাইনের সেই উক্তি এবং ৮০ বছর পরের প্রজন্ম কীভাবে স্মার্টফোন নিয়ে ধ্যানমগ্ন থাকছে তাঁর “প্রমাণ”। 

এরপর ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২ এবং ২০২৩ সালেও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এই বক্তব্যটি ব্যাপকভাবে প্রচার হতে থাকে। প্রতি বছরই ৮০ বছর আগে আইনস্টাইন এটি বলেছেন বলে দাবি করা হয়। কোনোরকম সত্যতা যাচাই ছাড়াই লাইক, শেয়ার ও কমেন্ট প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

২০২০ সালে আস্থা ডট লাইফ নামের একটি ব্লগসাইটে একজন ব্লগার ইন্টারনেট আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে লিখতে গিয়ে শুরুতেই আইনস্টাইনের বরাত দিয়ে লিখেন- “আমি আশঙ্কা করছি যেদিন প্রযুক্তি আমাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে অধিগ্রহণ করে নিবে এবং পৃথিবীতে থাকবে শুধু নির্বোধের প্রজন্ম।”

আইনস্টাইনের নামে এই উক্তিটি ২০১২ সাল থেকে অনলাইনে পাওয়া যায়। গুডরিডস, কোটফ্যান্সি, পিকচার কোটস-এর মতো জনপ্রিয় সাইটগুলোতেও আইনস্টাইনের নামে উক্তিটি প্রচারিত হয়েছে। এর আগে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশনাতে আইনস্টাইনের এই কথা বলেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।  

২০১২ সালে দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত একটি নিবন্ধেও বক্তব্যটি পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে নিশ্চিত করে বলা হয়নি যে এটি আইনস্টাইনের, বরং বাক্যটির আগে “সাপোজেডলি” শব্দটি বসিয়ে তিনি কথাটি বলে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হয়। 

বাংলা ভাষায় ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে এই উক্তি ছড়াচ্ছে। একই বছর যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডেইলি মেইলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “ওয়াজ আইনস্টাইন রাইট? ফিজিসিস্ট ওয়ান্স সেইড হি ফিয়ারড দ্যাট টেকনোলজি উড সারপাস হিউম্যান ইন্টার‌্যাকশন – এন্ড দিস ফটোজ শো দ্যাট টাইম মে নট বি ফার অফ” যার বাংলা অনুবাদ হলো, “আইনস্টাইন কি ঠিক ছিলেন? এই পদার্থবিদ একবার বলেছিলেন যে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে প্রযুক্তি মানুষের মিথস্ক্রিয়াকে ছাড়িয়ে যাবে – এবং এই ফটোগুলি দেখাচ্ছে যে সময় খুব বেশি দূরে নয়”। 

ডেইলি মেইলও উদ্বৃতিটি আইনস্টাইনের বলে নিশ্চিত করেনি। বরং তারা তাদের লেখায় বলেছে, “কিছু কিছু ইতিহাসবিদ প্রশ্ন তুলেছেন যে এই মহান ব্যক্তি কথাটি আদৌ বলেছেন কিনা।”  

আলোচিত উক্তিটি আসলেই আইনস্টাইনের কি না সেটি বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখেছে ডিসমিসল্যাব। এর সত্যতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় ফ্যাক্টচেকিং সাইট স্নোপস ডট কমে। সেখানে স্নোপস বলেছে, ইন্টারনেট দুনিয়ায় অনেক প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতা পেলেও “বড়জোর বলা যেতে পারে যে উক্তিটি বানোয়াট।”

স্নোপসের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের আগে আইনস্টানের বরাতে বা সূত্র ছাড়া এ ধরনের কোনো উক্তি অনলাইনে পাওয়া যায় না। তবে সে প্রতিবেদনে প্রযুক্তি নিয়ে আইনস্টাইনের ভাবনা নিয়ে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। 

১৯৩৯ সালের ২ আগস্ট আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে নতুন ধরনের পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা জানিয়ে চিঠি লেখেন। তিনি আতঙ্কিত ছিলেন যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আবিষ্কারকে হয়তো অপব্যবহার করে ভবিষ্যৎ মানবতাকে বিপর্যস্ত করে ফেলা হবে।

১৯৪৮ সালে তিনি তার বন্ধু মনোরোগবিদ অটো জুলিয়াসবার্গারকে চিঠিতে জানান, “আমার বিশ্বাস আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রাথমিক সূচনা ঘটে জীবনের যান্ত্রিকীকরণ ও মানবিক দিকগুলো বর্জনের মাধ্যমে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক বাইপ্রেডাক্ট”।

১৯৫৫ সালে আইনস্টাইন ও বার্ট্রান্ড রাসেল তাদের যৌথ চিঠিতে বিশ্বনেতাদের অনুরোধ করেন আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বগুলোর শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করার। আইনস্টাইন মূলত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মানবিকতাবর্জিত ব্যবহার নিয়ে আতঙ্কিত ছিলেন।

১৯৯৫ সালে আমেরিকান ফিল্ম  পাউডার- এর একটি চরিত্র ডোনাল্ড রিপ্লে বলেন, “আশঙ্কাজনকভাবে বিষয়টি পরিষ্কার যে প্রযুক্তি মানবতাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।” এরপরই পাউডার চরিত্রটি  বলে, “আলবার্ট আইনস্টাইন”। অর্থাৎ, দৃশ্যটি দেখলে মনে হতে পারে, রিপ্লির বলা উক্তিটি আইনস্টাইনের।

কোট ইনভেস্টিগেটর নামের ফ্যাক্টচেকিং সাইটে বলা হয় আইনস্টাইনের নামে প্রচারিত উক্তিটির পক্ষে কোনো যৌক্তিক প্রমাণ নেই। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত, এলিস ক্যালাপ্রিস সম্পাদিত একটি বিখ্যাত বই দ্য আল্টিমেট কোটেবল আইনস্টাইন। এই বইয়ে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে ১৬০০-র মত উক্তি রয়েছে। সেখানে আইনস্টাইন উক্তিতে প্রযুক্তি (technology)  শব্দটি এসেছে মাত্র ৫ বার। তাতেও এ ধরনের কোনো উক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি যেসকল ওয়েবসাইট, ব্লগ, পেজ থেকে এই তথ্যটি প্রচার করা হয় তারা কখনো কার্যকর সোর্স ব্যবহার করেনি। 

পলিটিফ্যাক্ট ডটকম থেকে জানা যায়, বিভিন্ন সময় আইনস্টাইনের বক্তব্যগুলো নিয়ে সমৃদ্ধ আর্কাইভ ও ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। তার কোথাও এ ধরনের উক্তি নেই। বরং তিনি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সমর্থন করতেন।

আফ্রিকাচেক ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় বিভিন্ন সময় উক্তিটির বিভিন্ন সংস্করণ অঞ্চলটিতে প্রচার করা হয়েছে। উইকিকোট সেগুলোকে উৎসহীন, সন্দেহজনক ও অতিরঞ্জিত বলে শ্রেণিভুক্ত করেছে।

এর আগে “যদি পৃথিবীর সকল মৌমাছি কোনো কারণে মারা যায় তবে পৃথিবী থেকে ৪ বছরের মধ্যে মানুষ নামক প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটবে” বলে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের নামে আরেকটি উক্তি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে এর সমর্থনেও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরো কিছু লেখা