
সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রচারিত একটি ভিডিওতে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর এক সদস্যের বৈঠকের ছবি ফাঁস হয়েছে। ভিডিওতে থাকা একই ধরনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে দাবি করা করা হচ্ছে সেগুলো আসল। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।
গত ৩০ জানুয়ারি “সিন্ধু সেন্টিনেল গ্রিড” নামের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, “গুরুতর তথ্য ফাঁস: বাংলাদেশের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ‘র’ এর সদর দপ্তরের খুব কাছেই ওবেরয় হোটেলে বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেই বৈঠকের ফাঁস হওয়া ছবিগুলো এখন প্রকাশ্যে এসেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আনছে এবং গুরুতর সব প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বৈঠকের সেই চাঞ্চল্যকর ছবি ও বিস্তারিত তথ্যগুলো দেখুন।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৭০ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে। রিপোস্ট করা হয়েছে আড়াই শ বারের বেশি।

ভিডিওতে ব্যবহার হওয়া মোট চারটি ছবিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুকে দেখতে পাওয়া যায়। তাদের ছবির সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যও দেখানো হয়।
পোস্ট শেয়ার করা অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এটি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত। এছাড়া সেটি গত বছরের জুলাইয়ে এক্সে সক্রিয় হয়েছে এবং একই মাসে ব্যবহারকারীর নামও (ইউজার নেম) পরিবর্তন করা হয়েছে।

“সিন্ধু সেন্টিনেল গ্রিড” ছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ও জার্মানি থেকে পরিচালিত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একই ভিডিও পোস্ট (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬) করা হয়।
এক্সে শেয়ার হওয়া যে ভিডিওতে দুজন বিএনপি নেতাদের ছবি দেখা যায়, সেটি ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় একই দাবিতে। ছবিগুলো আসল জানিয়ে তা পোস্ট করেন বেশকিছু ব্যবহারকারী। শাফিন রহমান নামের প্রোফাইল থেকে ছবিগুলো পোস্ট করে ক্যাপশনের শুরুতে লেখা হয়, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-(বিএনপি)-এর সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা সংযোগ।”

ক্যাপশনে আরও দাবি করা হয়, কয়েকটি “অসিন্ট (OSINT)” প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ ও আব্দুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা “র (RAW)”-এর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। দাবি অনুযায়ী, তারা নয়াদিল্লিতে একাধিকবার “র” এর অপারেটিভ কর্নেল গৌরব দোগরার সঙ্গে ওবেরয় হোটেলে বৈঠক করেছেন এবং সেই বৈঠকের ছবি ও ভিডিও প্রমাণ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। পোস্টে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এসব ছবি তৃতীয় পক্ষ নয়, বরং গোয়েন্দা সংস্থাটি নিজেই ফাঁস করে থাকতে পারে বিএনপিকে চাপ বা আলোচনায় আনতে। পাশাপাশি দাবি করা হয়েছে, সংযুক্ত ছবির মেটাডাটা যাচাই করা হয়েছে এবং এগুলো সত্য। প্রসঙ্গত, “অসিন্ট” হলো ইন্টারনেট ও অন্যান্য উন্মুক্ত উৎস থেকে বৈধভাবে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া।
শাফিন রহমান ছাড়াও একাধিক ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ থেকে চারটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে একই দাবিতে (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০)।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে গুগল জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল “সিন্থ-আইডি” (SynthID) ব্যবহার করে ডিসমিসল্যাব। প্রতিটি ছবি আলাদাভাবে দিয়ে সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি কি না জানতে চাইলে জেমিনির সিন্থ-আইডি ফিচার জানায়, সবকটি ছবিরই কোনো না কোনো অংশ গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।

একইভাবে, “সিন্ধু সেন্টিনেল গ্রিড” নামের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখানো একই ছবিগুলো আলাদাভাবে স্ক্রিনশট নিয়ে সেগুলোও ‘সিন্থ-আইডি’ (SynthID)-তে দেয় ডিসমিসল্যাব। ফলাফলে ছবিগুলোর কোনো না কোনো অংশ এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করে তৈরি বলে জানায় টুলটি।
অধিকতর যাচাইয়ে ছবিগুলো গুগলের ‘সিন্থ-আইডি’ প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশেষায়িত শনাক্তকরণ টুলেও পরীক্ষা করা হয়। এই টুলটি ছবির ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বিশ্লেষণ করে ভিজ্যুয়াল ফলাফল প্রদর্শন করে থাকে। পরীক্ষায় প্রতিটি ছবির ফলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। সেখানে টুলের শনাক্তকরণের আত্মবিশ্বাস মাত্রা বা ‘কনফিডেন্স লেভেল’ ছিল ‘উচ্চ’ (High) এবং ‘খুবই উচ্চ’ (Very High)। ফলাফলের হিটম্যাপে ছবির মূল চরিত্র, টেবিল এবং হোটেলের লবির দৃশ্যপটের সিংহভাগ অংশকেই নীল রঙের গ্রিড দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিন্থ-আইডির পরিভাষায় যার মানে হলো, ছবিগুলোর ওই নির্দিষ্ট অংশগুলো গুগল এআই টুলস ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে তৈরি।
অর্থাৎ, এক্সে প্রচারিত ভিডিওতে দেখানো ছবি ও ফেসবুকে শাফিন রহমানে প্রোফাইল থেকে প্রকাশিত পোস্টে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে “র” এর বৈঠকের ছবি দাবিতে ছড়ানো ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি।
উল্লেখ্য, শাফিন রহমান নামের প্রোফাইল থেকে পোস্ট হওয়া ছবির ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছিল– “পোস্টে সংযোজিত প্রতিটি ছবির’ই মেটা ডাটা চেক করা হয়েছে। ছবিগুলি শতভাগ সত্য।” যাচাইয়ের স্বার্থে তাকে আসল ছবির ফাইল চেয়ে মেসেজ করা হয়। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।