
বাড়িতে ঢুকে আওয়ামী লীগের নেত্রীকে পেটাচ্ছে বিএনপির নেতা, এমন দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, দৃশ্যটি ভারতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতনের একটি পুরোনো ভিডিও।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে মো. সুমন হোসেন নামের প্রোফাইল থেকে ১৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “এত আঘাত নেওয়ার মতো না।বাড়িতে ঢুকে আওয়ামী যুব মহিলা নেত্রীকে পেটাচ্ছে বিএনপির নেতা।”

ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ঘরের ভেতরে নীল রঙের শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি একটি লম্বা লাঠি দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা একজন নারীকে সজোরে বারবার আঘাত করছেন। মেঝেতে থাকা নারী হাত-পা নেড়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করছেন।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি আট লাখের বেশি ভিউ হয়েছে। শেয়ার হয়েছে ১০ হাজারের বেশি। এছাড়াও দেড় হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া ও আড়াই শর বেশি মন্তব্য জানানো হয়েছে।
উক্ত প্রোফাইল ছাড়াও সামাজিক মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) ও ফেসবুকের একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকেও একই দাবিতে ভিডিওটি প্রচারিত হতে দেখা যায় (১, ২, ৩, ৪)।
সত্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি কিফ্রেম সার্চ দিয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে এক্সে পোস্ট হওয়া হুবহু একই ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। “গ্যাজেট ৩৬০” নামের অ্যাকাউন্ট থেকে ওই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা আছে, “সংবেদনশীল – ভারতে এক ব্যক্তি লাঠি দিয়ে তার স্ত্রীকে প্রায় মেরে ফেলেছিল। তার মেয়ে, যে সেই মুহূর্তগুলো রেকর্ড করেছিল, সে তার বাবাকে থামতে অনুরোধ করছিল।”

পরবর্তী যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড লিখে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে সার্চ দিলে ভারত-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের এক্স অ্যাকাউন্টে ঝাপসা করে দেওয়া একই ভিডিও পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ১৯ মার্চের সে পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “স্ত্রীকে নির্মমভাবে মারধরের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জম্মুর এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার।”
ক্যাপশনটি গুগলে সার্চ দিলে রিপাবলিকসহ একাধিক ভারত-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে ভিডিওটির প্রেক্ষাপট উল্লিখিত প্রতিবেদন সামনে আসে (১, ২, ৩)।

রিপাবলিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের জম্মুর আম্ব ঘারোতা এলাকায় সাদাক হোসেন নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে ওই অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপরই স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং আম্ব ঘারোতা থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক ধারায় একটি এফআইআর দায়ের করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত সাদাক হোসেনকে তখন গ্রেপ্তার করে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছিল।
“ডিস্ট্রিক্ট পুলিশ জম্মু” নামের একটি পেজেও ঘটনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ হওয়া একটি পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে সাদাক হোসেন নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানানো হয়েছে।

এছাড়াও, ভারত-ভিত্তিক আরেকটি সংবাদমাধ্যম ইটিভি ভারতেও একই বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের জম্মুর আম্ব ঘারোতা এলাকায় স্ত্রীকে লাঠি ও কুড়াল দিয়ে নির্মমভাবে মারধরের অভিযোগে সাদাক হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তের পুত্রবধূ নুসরাত কাউসারের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, শাশুড়ি নূর জাহান মাঠে যাওয়ার সময় শ্বশুর সাদাক হোসেন এবং তার কয়েকজন সহযোগী মিলে তার ওপর হামলা চালায় ও জোরপূর্বক একটি ঘরে টেনে নিয়ে মারধর করে। ভিডিওটি প্রকাশের পর ব্যাপক জনরোষের সৃষ্টি হয়। পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) আওতায় একটি এফআইআর দায়ের করে মূল অভিযুক্ত সাদাক হোসেনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হামলায় ব্যবহৃত লাঠি ও কুড়াল উদ্ধার করা হয়েছে এবং বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অর্থাৎ, বাড়িতে ঢুকে আওয়ামী লীগের নেত্রীকে বিএনপি নেতার পেটানোর দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি ভারতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতিত হওয়ার একটি পুরোনো ভিডিও।
উল্লেখ্য, গত বছরের মার্চেও ভিডিওটি কাছাকাছি দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। পরবর্তীকালে তথ্য যাচাইকারী সংস্থা বুম বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ ভিডিওটি সত্যতা জানিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।