
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী ও নিম্নবিত্তদের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, যে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, তা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড নয়। এটি বাংলাদেশ প্রাক্তন সৈনিক কল্যাণ সংস্থার (বেসওয়া) নামের একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার “সমাজ সেবা” নামের একটি ফ্যামিলি কার্ড।
“বিডি টাইগার” নামের ফেসবুক পেজ থেকে সম্প্রতি ১ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “বিএনপি নামক চাঁদাবাজরা ফ্যামিলি কার্ডের নামে প্রতিবন্ধী ও নিম্নবিত্তদের সাথে অভিনব প্রতারণার অভিযোগ।”

ভিডিওতে দেখা যায় একজন সাংবাদিক বুম হাতে বলছেন, “ফ্যামিলি কার্ড, সমাজ সেবা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ১ হাজার ২২২ টাকার পণ্য ১ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে জনগণকে বলা হচ্ছে ১ হাজার ৫৫০ টাকার মালামাল। কিন্তু আমরা নিজেরা হিসাব করেছি, বর্তমান খুচরা রেট ১ হাজার ২২২ টাকা হয়। এখানে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।” এরপর ভিডিওতে থাকা সাংবাদিক কয়েক ক্রেতার সাক্ষাৎকার নেন। কয়েকজনকে ওই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া পণ্যের দাম বেশি বলে অভিযোগ করতে শোনা যায়।
“বিডি টাইগার” ছাড়াও একাধিক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি আপলোড করা হয় (১, ২, ৩, ৪, ৫)। এ সব ভিডিওর ক্যাপশনেও ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অভিযোগটি বিএনপির বিরুদ্ধে বলে দাবি করা হয়। কিছু পোস্টের ক্যাপশনে “অভিযোগ” না লিখে সরাসরি দাবি করা হয়, “প্রতিবন্ধী ও নিম্নবিত্তদের সাথে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড প্রতারণা (১, ২, ৩)”।

সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে “মোজাহিদ লাইভ” নামের পেজে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পোস্ট হওয়া ৩ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। যার প্রথম ১ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটি হুবহু মিলে যায়। তবে সেখানে বিএনপির কোনো উল্লেখ নেই। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা আছে, “ফ্যামিলি কার্ডের নামে প্রতিবন্ধী ও নিম্নবিত্তদের সাথে অভিনব প্রতারণার অভিযোগ।” ভিডিওতে থাকা সাংবাদিক উল্লেখ করেন, ওই ফ্যামিলি কার্ডটির নাম “সমাজসেবা ফ্যামিলি” কার্ড।

বিস্তারিত জানতে পেজটিতে থাকা একটি মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। মোহাম্মদ মোজাহিদ নামের এক ব্যক্তির জানান, “মোজাহিদ লাইভ” ফেসবুক পেজটি পরিচালনা করেন তিনি। যে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেটি কারা দিচ্ছে জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। নিজেকে সাংবাদিক দাবি করা মোজাহিদ বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের একটা সংগঠন আছে, ওই সংগঠনের সমাজ সেবা ফ্যামিলি কার্ড।”
বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা বিএনপির কোনো কর্মী এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন– “না, আমি বিএনপির সঙ্গে এদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাইনি।”
কিছুক্ষণ পর মো. মোজাহিদ নিজের করা একই ঘটনার একটি ফেসবুক লাইভ ভিডিওর লিংক ডিসমিসল্যাবকে পাঠান। ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ১৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ড। ভিডিওতে তাকে বেশ কয়েকজন ক্রেতার সাক্ষাৎকার নিতে দেখা যায়। তিনি নিজেও লাইভ ভিডিওতে কিছু বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেন।

ভিডিওর ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট অংশে বলেন, “নির্বাচনের মাত্র দুই দিন বাকি আছে, ফ্যামিলি কার্ডের নামে এখন যেই পণ্যগুলো দেওয়া হচ্ছে— এটি কি বিএনপির ঘোষিত যেই নির্বাচনী তফসিলে যেই ঘোষণা করা হয়েছিল ফ্যামিলি কার্ড দিবে তারা, এটি কি সেই ফ্যামিলি কার্ড কি না— এই ধরনের প্রশ্ন কিন্তু জনমনে উঠেছে। বাস্তবে এখানে তারা বলছেন যে, এটি বিএনপি ঘোষিত কোনো ফ্যামিলি কার্ড না। এটি হচ্ছে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের একটি সংগঠন। তারা এখানে মানুষের সেবা দিয়ে থাকে।”
একই ভিডিওর আরেক জায়গায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনের সাক্ষাৎকার নেন মোজাহিদ। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে “সমাজ সেবা” নামের ওই সংগঠন কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না– এমন প্রশ্নের জবাবে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “না না, এটা অরাজনৈতিক সংগঠন একটা। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন।”
অধিকতর যাচাইয়ে মো. মোজাহিদের কাছ থেকে “সমাজ সেবা” নামের প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে ডিসমিসল্যাব।

ছবির ওপরে লেখা আছে “সমাজ সেবা” এর বাম পাশেই একটি লোগো রয়েছে। তার নিচে লেখা “ফ্যামিলি কার্ড। মানুষের জন্য কাজ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।” এছাড়াও ওই ফ্যামিলি কার্ডে দেওয়া পণ্যের তালিকারও একটি ভিডিও পাঠান মো. মুজাহিদ।
পরবর্তী যাচাইয়ে কার্ডের অন্য পাশে থাকা মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানটির ডিলার রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে ডিসমিসল্যাব। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, “না। আসলে এটা হচ্ছে বাংলাদেশ প্রাক্তন সৈনিক কল্যাণ সংস্থা, বেসওয়া (BESWA) ট্রাস্ট।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক জিয়া তো ফ্যামিলি কার্ডের কথা মাত্র কিছুদিন আগে বলেছেন। আমাদের কার্যক্রম আরও ছয় মাস আগে থেকে চলছে। এখন তারেক জিয়া যে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলবে এটা তো আর আমরা জানি না।”
তিনি জানান, তাদের পণ্য বিতরণের তারিখ পার হয়ে যাচ্ছিল। এজন্যই সেদিন তারা সেগুলো দিতে যান। তিনি বলেন, “আমাদেরও চিন্তাভাবনা ছিল আমরা মালামাল দিব না। কিন্তু তারিখ চলে গেলে প্রতারণা হয়ে যেত, তাই মাল দিয়ে দিয়েছি।”
সাংবাদিক মো. মোজাহিদের পাঠানো একটি মূল্য তালিকার মতো একই মূল্য তালিকা ডিসমিসল্যাবকে পাঠান রফিকুল ইসলাম। মূল্য তালিকার তালিকার উপরে লেখা রয়েছে, “বাংলাদেশ প্রাক্তন সৈনিক কল্যাণ সংস্থা (বেসওয়া)।”

প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ৬৫/১৫ ট্রাস্ট। এর নিচেই লেখা আছে, “অ-রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী আত্ম কর্মসংস্থান মূলক সংগঠন।”
এছাড়াও, স্বল্পমূল্যে রেশন প্রদানের জন্য অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে দায়িত্ব দিয়ে বাংলাদেশ প্রাক্তন সৈনিক কল্যাণ সংস্থার দেওয়া একটি প্রত্যয়ন পত্রের ছবিও ডিসমিসল্যাবকে পাঠান রফিকুল ইসলাম। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মোঃ আলী নোয়েবের একটি স্বাক্ষর রয়েছে।
প্রত্যয়ন পত্রটিতে স্বল্পমূল্যে রেশন বিতরণের জন্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে অনুমোদন দেওয়ার তারিখ হিসেবে “১০ অক্টোবর, ২০২৫” উল্লেখ আছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পক্ষ থেকে নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয় গত নভেম্বরে।
অর্থাৎ, ভিডিওতে যে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, তা বিএনপির প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড নয়। বরং বাংলাদেশ প্রাক্তন সৈনিক কল্যাণ সংস্থার(বেসওয়া) নামের একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার “সমাজ সেবা” নামের একটি ফ্যামিলি কার্ড।