সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

ইন্টার্ন, ডিসমিসল্যাব
Fact-check report exposing fake “Amar Desh” photo cards spreading election misinformation on Facebook, falsely claiming Jamaat women were detained and BNP chairperson Tarique Rahman made an urgent call to Mufti Faizul Karim.

নির্বাচন নিয়ে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে আমার দেশের ভুয়া ফটোকার্ডে

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

ইন্টার্ন, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সংবাদমাধ্যম “আমার দেশ” এর নামে একাধিক ফটোকার্ড ছড়াতে দেখা গেছে। ১৪ জানুয়ারিতে প্রকাশিত দাবিতে একটি কার্ডে বলা হচ্ছে, গ্রামের সহজ সরল মহিলাদের ভোটার নাম্বার সংগ্রহ করতে যাওয়া জামায়াতের একদল নারী কর্মীকে পুলিশে দিয়েছে জনতা। অন্যদিকে আরেকটি ফটোকার্ডের শিরোনামে বলা হয়েছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমকে জরুরি ফোন করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, দুই ফটোকার্ডই নকল। এ সম্পর্কে আমার দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, এমন কোনো ফটোকার্ড বা প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমটি প্রকাশ করেনি।

১ম ফটোকার্ড

ফেসবুকের একটি পেজ থেকে গত ১৪ জানুয়ারি প্রথম ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। সংবাদমাধ্যম আমার দেশের আদলে বানানো সেই ফটোকার্ডের ছবিতে একটি কক্ষের ভেতরে কয়েকজন নারীকে দেখতে পাওয়া যায়। তাদের সামনে বেশ কিছু বই এবং পেছনের দেওয়ালে “মুজিবনগর থানা ভবন” দেখতে পাওয়া যায়। আর সেখানে লেখা, “বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরল মহিলাদের ভোটার আইডি কার্ডের নাম্বার সংগ্রহ করতে গেলে,জামায়াতের নারী কর্মীদের পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয় এলাকাবাসী।’’ ফটোকার্ডের উপরের অংশে আমার দেশ পত্রিকার লোগো দেখা যাচ্ছে। নিচের দিকে “১৪ জানুয়ারি ২০২৬” তারিখ এবং সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া আছে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ফটোকার্ডটি সাড়ে ৪ হাজারের বেশিবার শেয়ার করা হয়েছে এবং ৯ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মন্তব্য করেছেন হাজারেরও বেশি ব্যবহারকারী। একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই মহিলারা ত্যক্ত বিরক্ত করে ফেলতেছে,খুব ভাল লাগল।” আরেকজনের লিখেছেন, “এটা উত্তম কাজ।সারাদেশ এভাবেই করতে হবে।”

ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডটি আমার দেশের প্রকাশিত কি না তা যাচাই করতে সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারির সব ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো খুঁজে দেখে ডিসমিসল্যাব। তবে নির্দিষ্ট এই তারিখে জামায়াতের কোনো নেতাকে নিয়ে এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড বা খবর সংবাদমাধ্যমটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে খুঁজে পাওয়া যায়না। আবার প্রচারিত ফটোকার্ডে শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সঙ্গে আমার দেশ পত্রিকার ফটোকার্ডের ফন্টের পার্থক্য দেখা যায়।

আরও বিস্তারিত যাচাইয়ে ফটোকার্ডে থাকা ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেহেরপুরের মুজিবনগরে সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক করার অভিযোগে সাংগঠনিক বইসহ জামায়াতের আট নারী কর্মীকে পুলিশের গ্রেপ্তার করার ঘটনা এটি। মুজিবনগর থানা পুলিশ ৩০ ডিসেম্বর, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার গোপালনগর গ্রামের মোশারফ মাস্টারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। প্রতিবেদনে যে ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছ তার সঙ্গে ফটোকার্ডের ছবিটির হুবহু মিল পাওয়া যায়। ওই সময়ে ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন (, , ) প্রকাশ করেছিল আরও কিছু সংবাদমাধ্যম।

অর্থাৎ, পুরোনো একটি ঘটনার ছবিকে আমার দেশের ভুয়া ফটোকার্ডে যোগ করে বর্তমানে প্রচার করা হচ্ছে, যা সঠিক নয়।

২য় ফটোকার্ড

ফেসবুকের ব্যক্তিগত এক প্রোফাইল থেকে ১৫ জানুয়ারিতে ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। আমার দেশের আদলে বানানো সেই ফটোকার্ডে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমের ছবি ও তাদের দলের নির্বাচনী প্রতীক সংযুক্ত করে লেখা, “মুফতি ফয়জুল করীমকে তারেক রহমানের জরুরি ফোন!” ফটোকার্ডের উপরের অংশে আমার দেশ পত্রিকার লোগো দেওয়া। নিচের দিকে “১৪ জানুয়ারি ২০২৬” তারিখ এবং গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া আছে। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “বিএনপি ফোন করুক কিংবা সরাসরি এসে যোগাযোগ করুক।এতে আমরা বিচলিত নই।কারণ বিএনপি এর আগেও ৩০ সিটের অফার করেছে।ইসলামী আন্দোলন এতে কর্ণপাত করেনি।কারণ যারা শরিয়াহ আইন বিশ্বাস করেনা,তাদের সাথে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য হতে পারেনা।”

এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত ফটোকার্ডটি ৭০০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে এবং ১০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা পোস্টে দেড় হাজারের বেশি মন্তব্য করেছেন। একজন মন্তব্য করে লেখেন, “বিএনপির সাথে জোট করেন চরমোনাই সাহেব।” আরেকজন লিখেছেন, “রতনে রতন চিনে?”

আগের মতো একইভাবে সংবাদমাধ্যমটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের ১৪ জানুয়ারির ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। কিন্তু তারেক রহমানের সঙ্গে মুফতি ফয়জুল করীমের ফোনালাপের প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো ধরনের ফটোকার্ড বা খবর সংবাদমাধ্যমটির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে খুঁজে পাওয়া যায়না। এছাড়া, আমার দেশের ওয়েবসাইট ইউটিউব চ্যানেলে এ সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়না।

ফটোকার্ড দুটির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে আমার দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সম্পাদক আলফাজ আনাম ডিসমিসল্যাবকে নিশ্চিত করেন যে এমন কোনো ফটোকার্ড আমার দেশ প্রকাশ করেনি।

অর্থাৎ, আমার দেশের নামে প্রচারিত কার্ড দুটির দাবিগুলো ভুয়া। তবে আমার দেশের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া দাবি প্রচারের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগেও সংবাদমাধ্যমটির নামে একাধিক ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ফ্যাক্টচেক  প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাব।

আরো কিছু লেখা