মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Fact-check of a viral AI-generated video falsely claiming the Bangladesh Army brought Osman bin Hadi murder suspects back from India to Bangladesh.

ইরানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে ছড়াচ্ছে একাধিক এআই ভিডিও

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে দেখা গেছে নানা ধরনের অপতথ্য। পুরোনো ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ছবি-ভিডিওর পাশাপাশি ছড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো কনটেন্টও। আর এবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে বেশকিছু ভুয়া তথ্য; যেখানে বলা হচ্ছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে ইরানে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, এসব ভিডিও বানানো হয়েছে এআই দিয়ে এবং বর্তমানে ইরানে কোনো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন চালু নেই। 

বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত “ডেইলি স্পার্ক” নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ইরান-ইসরায়েলের চলমান সংঘাত নিয়ে এমন অন্তত ১৬টি ভিডিও ছড়াতে দেখেছে ডিসমিসল্যাব। ভিডিওগুলোতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে ইরানের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রদান করছে। আবার কিছু ভিডিওতে ইরানের জনগণের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও ইফতার বিতরণ করতেও দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ ভিডিওতেই সেনাবাহিনীর পোশাকে থাকা ব্যক্তিদের বলতে শোনা যাচ্ছে, “আমরা মুসলিমরা একে অপরের ভাই।”

পোস্টগুলো যাচাইয়ে দেখা গেছে, এর সবগুলো প্রায় একই দাবিতে শেয়ার হয়েছে। বলা হচ্ছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইরানের অবস্থান করছে। যেমন, গত ১৩ মার্চ পেজটি থেকে ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।” ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর নীল রঙের বেরেট (টুপি) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আদলে ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্মে একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমের মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলছেন। 

Fact-check of a viral AI-generated video falsely claiming the Bangladesh Army brought Osman bin Hadi murder suspects back from India to Bangladesh.
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের দাবিতে ছড়ানো এআই ভিডিওটি শেয়ার করা ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

ভিডিওতে কথা বলতে থাকা ব্যক্তির ডান হাতে বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘের লোগোযুক্ত ব্যাজ রয়েছে। তিনি বলছেন, “জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখানে নিয়োজিত আছি। তো সেই সুবাদে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষ্যে, আমরা আজকে প্রায় তিনশত মানুষের মাঝে ইফতার বিতরণের আয়োজন করেছি। আমরা মুসলিমরা একে অপরের ভাই, আমাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন এবং আমাদের এই উদ্যোগটি ভালো লাগলে ভিডিওতে সবাই বেশি বেশি লাইক, কমেন্ট এবং শেয়ার করবেন।”

মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা ওই ব্যক্তির পেছনে আরও বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য একটি লম্বা টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী, পুরুষ ও শিশুদের হাতে সবুজ রঙের বাক্স তুলে দিচ্ছেন। টেবিলের সামনে একটি ব্যানার ঝোলানো আছে যেখানে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে- “ বাংলাদেশ আর্মি (Bangladesh Army)”, “পিসকিপিং মিশন- ইফতার ডিস্ট্রিবিউশন (Peacekeeping Mission – Iftar Distribution।” 

Fact-check of a viral AI-generated video falsely claiming the Bangladesh Army brought Osman bin Hadi murder suspects back from India to Bangladesh.
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের দাবিতে ছড়ানো এআই ভিডিওটি শেয়ার করা ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

এ পর্যন্ত ভিডিওটি দেখেছেন ৯ লাখের বেশি ব্যবহারকারী। শেয়ার হয়েছে ২০ হাজারের বেশি। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি আর মন্তব্য করেছেন প্রায় আড়াই হাজার ব্যবহারকারী। ভিডিওর মন্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেকেই এটি বাস্তব ঘটনার দৃশ্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন। একজন লিখেছেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আপনাদের অনেক ধন্যবাদ আমি বাংলাদেশ থেকে বলছি আপনারা অনেক মহান কাজ করতেছে আল্লাহ তোমাদের শোয়াই থাকবে সব সময় ধন্যবাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।” আরেকজন লিখেছেন, “ধন্যবাদ বাংলার সন্যদের।” এছাড়াও একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটাই মুসলিম দেশের কর্তব্য।” 

ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে প্রথমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন বর্তমানে বিশ্বের কোন কোন দেশে চলমান আছে, তা খুঁজে দেখা হয়। সংস্থাটির দাপ্তরিক ডিরেক্টরি অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১১টি শান্তিরক্ষা মিশন সক্রিয় রয়েছে। তবে এর মধ্যে একটিও ইরানে পরিচালিত হচ্ছে না। দেশটিতে পরিচালিত জাতিসংঘের একমাত্র শান্তিরক্ষা মিশনটি ছিল ইউনিমগ (UNIIMOG), যা ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যকাল শেষ করে।

Fact-check of a viral AI-generated video falsely claiming the Bangladesh Army brought Osman bin Hadi murder suspects back from India to Bangladesh.
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের দাপ্তরিক ডিরেক্টরির স্ক্রিনশট।

এছাড়াও, “ডেইলি স্পার্ক” পেজ থেকে পোস্ট হওয়া ভিডিওটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর নিচে ডান কোণে ভিও (VEO) লেখা জলছাপ রয়েছে। ভিও হলো গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বার্তা থেকে সরাসরি ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম ভিডিও জেনারেটর টুল।

Fact-check of a viral AI-generated video falsely claiming the Bangladesh Army brought Osman bin Hadi murder suspects back from India to Bangladesh.
গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থআইডি (SynthID) দিয়ে যাচাইয়ের ফলাফলের স্ক্রিনশট।

অধিকতর যাচাইয়ে ভিডিওটি গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থআইডি ((SynthID) দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সিন্থআইডি জানায়, “এই ভিডিওটির অডিও এবং ভিজ্যুয়াল উভয়ই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে। ভিডিওটির সম্পূর্ণ অংশ জুড়েই (০:০০-০:১৫) সিন্থআইডি ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করা হয়েছে।”

একই পেজ থেকে পোস্ট হওয়া আরেকটি ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর নীল রঙের বেরেট (টুপি) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম পরা একজন ব্যক্তি একটি মাইক্রোফোন হাতে কথা বলছেন। তিনি বলছেন, “প্রিয় দেশবাসী, আমরা ইরানের হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা দিচ্ছি। আমাদের জীবন অনেক ঝুঁকিতে আছে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন এবং আমাদের এই উদ্যোগটি ভালো লাগলে ভিডিওতে সবাই বেশি বেশি লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার করবেন।” মাইক্রোফোন হাতে কথা বলা সেনা সদস্যের ডান হাতে জাতিসংঘের লোগো, বুকের বাম পাশে বাংলাদেশের পতাকার ব্যাজ এবং ডান বুকে “ক্যাপ্টেন (CAPTAIN)” লেখা নেম ট্যাগ দেখা যাচ্ছে। 

তার পেছনে একটি বিশালাকার জাহাজের ডেকে অনেক সেনাসদস্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মাথায় নীল রঙের বেরেট বা টুপি এবং হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। জাহাজটি মাঝসমুদ্রে অবস্থান করছে। আর পেছনের দিকে পাহাড়ি উপকূল এবং দূরে আরও কিছু জাহাজ ভাসতে দেখা যাচ্ছে।

ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, “জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি আড়াই লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। শেয়ার করা হয়েছে দুই হাজারেরও বেশিবার। এছাড়াও প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য জানানো হয়েছে যথাক্রমে ১৩ হাজার ও দুই শর বেশি। মন্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণে বোঝা যায়, অনেকেই ভিডিওর দৃশ্য ও তথ্য সত্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন। একজন লিখেছেন “আপনাদের জন্য দোয়া রহিল মনের গভীর থেকে।” আরেকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ধন্যবাদ স্যার আপনারা এমন সাহস করে যে ইরানের পাসে আছেন এবং বাংলা দেশের অনেক টাই সাহায্য করেছে ইরান স্যালোট স্যার আপনাদের কে এই বলে আজকের মত বিদাই নিলাম ইতি আঃ মজিদ কুয়েত থেকে।” 

তবে ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা যায়, এই ভিডিওটিও এআই দিয়ে তৈরি বানানো হয়েছে। এটির নিচেও ডান কোণে ভিও (VEO) লেখা জলছাপ রয়েছে, যা গুগলের একটি এআই ভিডিও জেনারেশন মডেল। ভিডিওটি গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থআইডি দিয়ে পরীক্ষা করা হলে জানা যায়, এটির অডিও এবং ভিজ্যুয়াল উভয়ই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।

ইরানে জাতিসংঘের শান্তিমিশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করছে, এমন দাবিতে আরও অন্তত ১৪টি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে পেজটি থেকে (, , , , , , , , ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪)। 

Fact-check of a viral AI-generated video falsely claiming the Bangladesh Army brought Osman bin Hadi murder suspects back from India to Bangladesh.
ইরানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের দাবিতে একই পেজ থেকে ছড়ানো আরও একাধিক এআই ভিডিওর স্ক্রিনশট।

সবগুলো ভিডিওতেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যামোফ্লেজ পোশাক পরহিত সদস্যদের কথা বলতে দেখা যায়। বক্তব্য ও দৃশ্যে ভিন্নতা থাকলেও প্রতিটি ভিডিওর দৈর্ঘ্য ১৫ সেকেন্ড। ভিডিওগুলোর ঠিক নিচে ডান দিকে গুগলের ভিডিও জেনারেশন মডেল ভিও-র জলছাপ রয়েছে। আর গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল সিন্থআইডি দিয়ে পরীক্ষা করা হলে সবগুলো ভিডিওতেই সিন্থআইডির ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়েছে। যা ভিডিওগুলো গুগলের এআই মডেল দিয়ে বানানো বলে নির্দেশ করে। 

এছাড়া, ইরানে বা হরমুজ প্রণালিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোনো খবর মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

ফেসবুকে এআই কনটেন্ট দিয়ে অপতথ্য ছড়ানো “ডেইলি স্পার্ক” পেজটি চালু করা হয়েছে গত ৪ মার্চ। বর্তমানে পেজটির ফলোয়ার সংখ্যা ৬০ হাজার। বায়োতে লেখা, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশ প্রেমের অপর নাম।।”

আর পেজটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে ইরানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মোতায়েনের ভুয়া দাবি ছাড়াও ভিন্ন দাবিতে পেজটি থেকে বেশকিছু ভিডিও প্রচারিত হতে দেখা যায়। গত ২৯ মার্চ পেজটি থেকে একটি ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “সেনাবাহিনী ওসমান হাদির খু’নিদের ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত নিয়ে এসেছেন।” পরবর্তীকালে ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো জানিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাব।

আরো কিছু লেখা